মারিয়ানা ট্রেঞ্চ: সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার জগৎ

পৃথিবীর সৌন্দর্য্যের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ কমই আছে। কিন্তু যত না সুন্দর এই পৃথিবী ততই ঘেরা রহস্যে। এই রহস্য জানতে মানুষের ছুটে চলা দূরদূরান্তে। কখনো মহা শূন্যে কিংবা পাহাড়ের চূড়ায়, কখনো চলে গেছে সমুদ্রের বুকে কিংবা ডুব দিয়েছে তার অতল গভীরে।মহাশূন্যে কিংবা মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের গাঁথা বহু আগেই শোনা হয়েছে কিন্তু যে ভূমিতে আমাদের সদা বিচরণ সেই ভূমির গভীরটাই আজও অজানা। জানতে হলে চলে যেতে হবে পৃথিবীর গভীরতম স্থানে, যে গভীরে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতাও তুচ্ছ। যার খোঁজ মেলে নিকষ অন্ধকার মেঘে ঢাকা সমুদ্রের অতল গভীরে। যার পরিচয় সমুদ্রের গভীরে এক অন্ধকার জগৎ মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নামে।

মারিয়ানা নামটির সাথে মিশে আছে রাজকীয়তা।স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপের রানি ছিলেন মারিয়ানা। তাঁর নামেই নামকরণ হয়েছিল প্রশান্তমহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের। তবে এই দ্বীপগুলি আসলে ডুবে থাকা কিছু ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির চূড়া।

এই দ্বীপপুঞ্জ হতে ২০০ কি.মি. পূর্বে বিস্তৃত বিশ্বের গভীরতম মহাসাগরীয় খাত যা ২৫৫০ কি.মি. লম্বা এবং ৬৯ কি.মি. চওড়া। সামুদ্রিক এই খাতের নামকরণ হয়েছে নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জের নামে। ফলে গভীরতম খাতের নাম হয় ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এর সৃষ্টি নিয়ে অনেক মত রয়েছে তবে ভূতাত্ত্বিকগণ মনে করেন কোনো এক সময় পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা দু’টি টেকটনিক পাতের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, ফলে একটি পাত অন্যটির নিচে চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয় মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো গভীর সামুদ্রিক খাত।

কতটা গভীর মারিয়ানা ট্রেঞ্চ?

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা প্রথম বার মাপে ব্রিটিশ জাহাজ এইচ এম এস চ্যালেঞ্জার। পরে বহু বার এই গভীরতম খাত নিয়ে গবেষণা হলে পরিবর্তন হতে থাকে এর গভীরতম পরিমাপ। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর অংশের নাম ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ যা দেখতে কিছুটা ইংরেজি V অক্ষরের মত। ধারণা করা হয় এর গভীরতা ১১০০০ মিটারেরও বেশি। হিসেব মতে সমুদ্রের নীচে ১০০০ মিটার তলদেশ পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় তারপর শুধু অন্ধকার, ঘন কালো জল। এর গভীরতা বোঝানোর জন্য বলা হয়, যদি মাউন্ট এভারেস্টকে এর মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে আরও প্রায় ১.৬ মিটারের মতো জায়গা বাড়তি পড়ে থাকবে। বলাই বাহুল্য পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গও মারিয়ানার গভীরতার কাছে পরাজিত।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। সেই কৌতুহল নিয়েই ১৯৬০ সালে সর্ব প্রথম দুই দুঃসাহসী অভিযাত্রী জাক পিকার্ড এবং মার্কিন নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ডন ওয়ালশ পৌঁছেছিলেন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে। পাঁচ ঘণ্টার দুঃসাহসিক যাত্রার পরে গন্তব্যে পৌছতে পেরেছিলেন পিকার্ড এবং ওয়ালশ। তবে এর গভীরে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ২০ মিনিট। তাঁরা ১০,৯১৬ মিটার অবধি নামতে পেরেছিলেন তবে এর গভীরতা বাকি ছিল আরো। এত পরিশ্রমের পরেও দুঃসাহসিক এই যাত্রায় সম্ভব হয়নি কোনো ছবি তোলা। কারণ তাঁদের যাত্রাপথ ঘিরে ছিল ক্লাউড অব সিল্ট। কি ভাবছেন আকাশে থাকা মেঘ মহাসাগরের গভীরে এল কোথা থেকে?

আসলে এগুলো মেঘ নয় বরং এ হলো বালি, কাদামাটি ও অন্যান্য উপকরণের সমষ্টি যা জলের প্রবাহে জমাট বেঁধেছে। সেই জমাটবদ্ধ কাদামাটির অংশই মেঘের মত ঢেকে রাখে এর গভীরতাকে।

তবে থেমে থাকেনি মারিয়ানা অভিযান, প্রথম অভিযানের পরে ২০১২ সালে ফের মানুষের অবতরণ হয় মারিয়ানা খাতে। এ বার সাব-ডাইভ দেন চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরন। তবে পৌঁছাতে পেরেছিলেন মাত্র ১০,৯০৮ মিটার অবধি। সম্প্রতি এক অভিযাত্রী ভিক্টর ভেসকোভো পৌঁছেছেন ১০,৯২৭ মিটার অবধি। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গভীরে যাওয়ার রেকর্ড এটি।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নিয়ে কৌতুহল বেড়ে যায় যখন পিকার্ড দাবি করেন, তিনি গভীর খাতে একটি ফ্ল্যাটফিশ দেখেছিলেন। তবে এতে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর সহমত ছিলনা। তাঁদের মতে, গভীরতম এই খাতের যত গভীরে যাওয়া যাবে জলের চাপ ততই বাড়বে, যা ক্যালসিয়াম দ্রবীভূত করতে সক্ষম। আর ক্যালসিয়ামই যদি গলে যায় প্রাণীর হাড়ের গঠন তো অসম্ভব। বলা হয় জলের চাপ এতই যে ইস্পাতও বেকে যাবে! তাহলে প্রাণের অস্তিত্ব তো বহু দূরের কথা। যদিও গভীরে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা প্রমাণিত হয়নি তবে তুলনামূলক অগভীর অংশে অ্যাম্ফিপড এবং হলোথুরিয়ান্সের মতো সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব আছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে প্রাণীবিজ্ঞানের আরও অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করছে মারিয়ানা খাতের নিকষ অন্ধকারে। সেই রহস্য জানা গেলে বায়োমেডিসিন ও বায়োটেকনলজির অনেক বন্ধ দরজা খুলে যাবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মারিয়ানা খাতের অন্ধকার ভেদ করতে পারলে জানা যাবে পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টির রহস্য ।

রহস্যময় এই পৃথিবীর রহস্য কে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। এই খাত নিয়ে যতই ধারণা করা হয় একে একে সব ভুল প্রমাণ করে জন্ম নেয় আরেক রহস্য। নির্দ্বিধায় বলা যায় পৃথিবীর এই বিস্ময়কর মারিয়ানা খাতের নিকষ অন্ধকারে অপেক্ষা করছে অজানা কিছু। এ যেন সমুদ্র বুকে আরেক পৃথিবী যার খোঁজ অনন্ত।

আরো পড়ুন: প্যারালাল ইউনিভার্সে হুবহু আপনার মতো আরেকজন মানুষ আছে!

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker