ফুলের সুবাসে পচা মাংসের আভাস

সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতিকে সাজাতেই বোধহয় সৃষ্টি করেছিলেন ফুল। তাইতো ঘর সাজানো কিংবা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ, যে কেউই নির্দ্বিধায় ফুলই বেছে নেয়। ফুলের মিষ্টি সুবাস আর মন ভোলানো সৌন্দর্য্যের জন্যই হয়তো বিশ্বজুড়ে তার এত কদর।

কিন্তু পৃথিবী এক অদ্ভুত স্থান। এমনও ফুল আছে যাদের মিষ্টি সুবাস তো দূরে থাক বরং ফুলের সুবাসে পচা মাংসের আভাস পাওয়া যায়, নাকে আসতেই গা গুলিয়ে যাবে যে কারো। যেকারনে এই ফুল corpse flower নামেই বেশি পরিচিত। তবে মজার বিষয় হলো যেখানে তীব্র পচা গন্ধে পাশ ঘেঁসাও দায় সেখানে অনেকেই মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে টিকিট কাটে এই ফুল দেখতে।

এই পর্যন্ত পৃথিবীতে বিশালাকৃতির দুটি প্রজাতির ফুল গাছ পাওয়া গেছে – টাইটান আর র‌্যাফেশিয়া আরনোল্ডি। অন্যান্য ফুলের মত এদের থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ আসে না বরং ভেসে আসে পচা মাংসের গন্ধ। তবে বিচ্ছিরি গন্ধের কথা বাদ দেওয়া হলে, সৌন্দর্য্যের মাপকাঠিতে এই ফুল নজর কাড়তে বাধ্য।

প্রথমেই আসি corpse plant নামে খ্যাত টাইটানের কাছে —

১. টাইটান

বিরল প্রজাতির টাইটান গাছের আদি উৎপত্তিস্থল ইন্দোনেশিয়া ও জাভা অঞ্চল। গাছটির বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘অ্যামোরফোফালাস টাইটানাম‘। এই গাছের জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশ ও আবহাওয়ার প্রয়োজন হয় বলে গাছটির পরিচর্যা করা অত্যন্ত কঠিন। আবার কোনোভাবে গাছের পরিচর্যা করা গেলেও এই গাছে ফুল ফোটার ঘটনা খুবই বিরল। এই প্রজাতির গাছে ফুল ধরতে সময় লাগে প্রায় ১০ – ২০ বছর কিংবা তারও অধিক।

টাইটানের বিশেষত্ব হলো এর অস্বাভাবিক দানবাকৃতি। চুরুটের ন্যায় আকৃতির এই গাছটি প্রায় ১২ফুট উচ্চতার হয়ে থাকে। বলতে গেলে একতলা বিল্ডিং হতে কম হবে না। এই গাছে ফুল সবসময় ফোটে না আর ফুল ফুটলেও তা মাত্র ১-২ দিন স্থায়ী হয়। তাই যখনই ফুল ফুটে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে যায়।

সৌন্দর্যের দিক থেকে বিচার করলে গাছটি দর্শনীয় হলেও এর ফুলের গন্ধ পচা মাংসের মতো। এর দুর্গন্ধ এতই তীব্র যে স্বাভাবিক ভাবেই কেউ এর কাছে যেতে চাইবে না। তবে এর পুরো উল্টো চিত্রই দেখা যায় আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো বোটানিক্যাল গার্ডেনে। এখানে খুব অল্প সময়ের জন্য ফোটে বিরল প্রজাতির এক ধরনের ফুল। সেই ফুলের গন্ধ পচা মাংসের মতো অসহ্যকর। কিন্তু হাজার হাজার লোক টিকিট কেটে সেখানে যান ওই ফুল দেখতে। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে একটা টিকিটের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার পার্কে থাকা ওই ফুলগাছই টাইটান প্লান্ট যা ‘কর্পস প্ল্যান্ট’ নামে বেশি পরিচিত।

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ওই পার্কে প্রায় ১০ বছর পর ‘কর্পস প্ল্যান্টে ফুল ধরে ছিল যা মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সে সময় দিনে পাঁচ হাজারের বেশি দর্শক টিকিট কেটে এসেছিলেন ‘কর্পস প্ল্যান্ট’ দেখতে। তবে স্বল্পায়ুর এই ফুল থেকে পচা মাংসের গন্ধ বের হওয়ার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে । এর পচা গন্ধে আকৃষ্ট হয় ক্যারিয়ন বিটলস, ফ্লেশ ফ্লাইয়ের মতো পতঙ্গরা, যা ফুলের পরাগায়নে সহায়ক। তবে নির্দিষ্ট পরিবেশের অভাবে বিরল এই প্রজাতির গাছটির নাম ইতিমধ্যে নথিভুক্ত হয়েছে বিলুপ্তির খাতায়। বর্তমানে পৃথিবীতে টাইটানের গাছ সংখ্যা মাত্র হাজার খানেকের মতো।

টাইটানের মতোই আরেকটি দৈত্যাকার গাছ র‌্যাফেশিয়া আরনোল্ডি। নাম ভিন্ন হলেও কাজ একই । এই ফুল থেকেও ভেসে আসে পচা মাংসের তীব্র গন্ধ।

২. র‌্যাফেশিয়া আরনোল্ডি

ইন্দোনেশিয়ার রেইনফরেস্টে র‌্যাফেশিয়া আরনোল্ডি ফুলের জন্ম। র‌্যাফেশিয়া দেখতে একেবারে গোলাকৃতির গামলার মতন। তবে ছোট খাটো কোনো গামলা নয় বরং লম্বায় এই ফুল তিন ফুটকেও ছাড়িয়ে যাবে, যার ওজন ১৫ পাউন্ডেরও বেশি হয়।

র‌্যাফলেশিয়ার ফুলের বৈশিষ্ট্যও কিন্তু কম বিচিত্রময় নয়। একে তো আকারে বিশাল, তার ওপর রয়েছে প্রচণ্ড দুগর্ন্ধ। ফুলের সুবাসে পচা মাংসের আভাস পাওয়া যায়। যে কারণে অনেক দেশেই র‌্যাফেশিয়া ‘ কর্পস ফ্লাওয়ার বা শব ফুল ‘ নামে পরিচিত। এই ফুলের পচা গন্ধতে পোকা-মাকড় আকৃষ্ট হয়, যা এর বংশ বিস্তারে সহায়ক। তবে আকারে যতই বড় হোক না কেন, আয়ু কিন্তু খুব বেশি নয়। মাত্র সপ্তাহখানেক টিকে থাকে এ ‘মনস্টার ফ্লাওয়ার’। এখন, বৈশিষ্ট্যের দিকে বিচার করলে কিন্তু র‌্যাফেশিয়াকে টাইটানের ভাই বললে ভুল হবে।

তবে অদ্ভুত বিষয় কি জানেন? আপনি চাইলেও এই ফুল খুঁজে বের করতে পারবেন না। একমাত্র ফুল ফুটলেই এদের খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ র‌্যাফলেশিয়ার কোনো পাতা ও শেকড় নেই। এই ফুলে গাছটি পরজীবী। মানে এরা অন্য কোনো গাছের ওপর ভর করে বাঁচে আর তার থেকেই পুষ্টি সংগ্রহ করে।বলতে গেলে অন্যের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার মতই।

দানবাকৃতির এই ফুলটিকে খুব সহজেই আলাদা করা যায়। সূত্র মতে,২০২০সালে পশ্চিম সুমাত্রীয় জঙ্গলে প্রায় চার ফুট ব্যাসের একটি র‌্যাফেশিয়া আরনোল্ডি ‍ফুল ফুটেছিল। স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বিশ্বের মধ্যে এটিই এযাবৎকালে খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় ফুল।মজার বিষয় হচ্ছে, ২০১৭ সালে ঠিক একই জায়গাতেই রেকর্ডভুক্ত সবচেয়ে বড় ফুলটি পাওয়া গিয়েছিল। তবে সঠিক পরিচর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে বিরল প্রজাতীর এই ফুলটিও বিপন্ন প্রায়।

যদি ফুলকে বলা হয় প্রকৃতির অঙ্গসজ্জা তাহলে কর্পস ফ্লাওয়ার নির্দ্বিধায় প্রকৃতির বিষণ্ণতা। তবুও প্রকৃতি সুন্দর তার বৈচিত্র্যে। নিজের মধ্যেই জন্ম দেয় নানান কৌতুহল। যেখানে ফুল মানেই স্নিগ্ধতা সেখানেই প্রকৃতি অদ্ভুত সৃষ্টি টাইটান আর র‌্যাফেশিয়া।

বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker