জাপানের রহস্যময় সুইসাইড ফরেস্ট

চারিদিকে নিকষ অন্ধকার আর গভীর ঘন বন। দিনের বেলায়ও এই অন্ধকার ভেদ করে আসতে পারে না সূর্যের আলো। আবছা আলোয় আশে পাশে তাকালেই গা ছম ছম একটা ভাব। পা বাড়ালেই বাড়তে থাকে গভীরতা আর নাকে আসে লাশ পঁচা উদ্ভট গন্ধ। যত গভীরে যাওয়া যাবে গাছ না কেবল চোখে পড়বে গাছে ঝোল অর্ধ গলিত লাশ। কি মনে হচ্ছে, কোনো ভৌতিক সিনেমা নাকি উপন্যাসের প্লট? না, কোনো সিনেমাও নয় কোনো উপন্যাসও নয়। এটা বাস্তবে জাপানের রহস্যময় সুইসাইড ফরেস্ট। ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নয় বরং আত্মহত্যাকারী হতেই এ বনের পথে পা বাড়ান অসংখ্য মানুষ।

আবার অনেকেই বলে এই বন গোলকধাঁধার মত। একবার গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। তাইতো অওকিগাহারার পরিবর্তে সুইসাইড ফরেস্ট নামেই বেশি পরিচিত। এখন প্রশ্ন হলো, আত্মহত্যার আসল কারণ কি এই বন নাকি বনে আছে কোনো অপশক্তির প্রভাব? চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, রহস্যে ঘেরা সুইসাইড ফরেস্টের আত্মহত্যার আসল কাহিনী।

জাপানের কুখ্যাত সুইসাইড ফরেস্ট অওকিগাহারা। আত্মহত্যার জন্য বনটি বেশ পরিচিত। ঘন গাছপালার কারণে গোলকধাঁধাময় এই বনটিতে প্রবেশ করলেও, এখান থেকে বের হওয়া মুশকিল আবার অনেকে ফিরেই আসে না। তাই তো দিনের বেলাতেও কেউ এই বনের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না। তার উপর গাছে থাকা ঝুলন্ত লাশ আর আসে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কঙ্কাল মুহুর্তেই গা হিম করা পরিবেশ সৃষ্টি করতে যথেষ্ট। এধরণের কিছু ভয়ংকর তথ্যই অওকিগাহারাকে করে তুলেছে পৃথিবীর রহস্যময় স্থানগুলোর একটি।

অবাক করা তথ্য হলো, অন্যান্য দেশে আত্মহত্যা অপরাধ বলে গণ্য হলেও, একসময় জাপানের ঐতিহ্যে আত্মহত্যার প্রচলন ছিল। প্রাচীন কালে জাপানের সামুরাই নীতি অনুসারীরা আত্মহত্যাকে মুক্তির পথ হিসেবে বিশ্বাস করতেন। তাদের ধারণা এর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যায়। যে কারণে একটা সময় পর্যন্ত আত্মহত্যাকে জাপানি সমাজে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হত। যদিও এখনো অনেক জাপানি এ নীতিতে বিশ্বাস করেন।

আত্মহত্যার কারণ খুঁজলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় জাপানে আত্মহত্যার হার ছিল লক্ষণীয়। মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণেই সে সময় অধিকাংশ লোক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। যায় ফলে জাপান সরকার আত্মহত্যার হার কমানোর জন্য একটি আইন পাস করে। পরবর্তী সাত বছরের মধ্যে আত্মহত্যার হার ২০% কমিয়ে আনাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এছাড়াও বনের বিভিন্ন জায়গায় সতর্কতা মূলক সাইনবোর্ড লাগানো হয়।

তবে অনেকেরই ধারণা অর্থনৈতিক মন্দ কিংবা মানসিক চাপ নয় বরং এই বনই অভিশপ্ত। জাপানের রহস্যময় সুইসাইড ফরেস্ট নিয়ে অনেক লোককথা আছে। বলা যায় জাপানের লোকসাহিত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে এই অওকিগাহারা বন বা সুইসাইড ফরেস্ট। প্রাচীন কালে জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। অনাহারের কষ্ট লাঘবে পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্যকে রেখে আসা হতো এই বনে। যেখানে আত্মহত্যা নয়, বরং পানি ও খাবারের অভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত তারা। অনেকেই বিশ্বাস করেন ঐ মৃত বৃদ্ধদের অতৃপ্ত আত্মা প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের পথভ্রষ্ট করে দেয় এবং তাদের আত্মহত্যায় প্রলুব্ধ করে।

আত্মহত্যার বিষয়টি না হয় বাদ দিলাম। তারপরেও অওকিগাহারা বা সুইসাইড ফরেস্ট, ভ্রমণের জন্য উপযোগী কিনা তা নিয়ে রয়েছে বেশ সংশয়। কেননা পরীক্ষা করে জানা, অওকিগাহারার মাটিতে ম্যাগনেটিক আয়রনের পরিমাণ এতই বেশি যে জিপিএস সিস্টেম তো দূরের কথা কম্পাসও এখানে অচল। তার ওপর অদ্ভুত রকমের মোচড়ানো ও বাঁকানো আকৃতির গাছ আর দম বন্ধ করা তীব্র নিস্তব্ধতা যা যে কারো মনে অতিপ্রাকৃতিক অনুভূতির জন্ম দিতে সক্ষম। তার সাথে রয়েছে রয়েছে শত শত গর্ত ও অন্ধকার গুহা। সব কিছু মিলিয়ে বনের এই ভৌতিক গঠন যেন বনের রহস্য আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker