পড়ার সময় ঘুম তাড়ানোর কার্যকরী উপায়

বয়স কম হোক কিংবা বেশি বই সামনে নিয়ে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন রাজ্যের ঘুম চোখে এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে। মনে হয় বইয়ের পাতায় পাতায়, অক্ষরে অক্ষরে কেউ ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছে।বিশেষ করে ছাত্রজীবনে পড়তে বসে ঘুম আসেনি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ায় নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করতে না পেরে পরীক্ষা খারাপের রেকর্ডও আছে অনেকের। আর এ কারণে প্রায়ই নাজেহাল হন অভিবভাবকরা। আপনি যদি বেশিক্ষণ জেগে পড়তে না পারেন, এবং পড়ার সময় ঘুম তাড়ানোর কার্যকরী উপায় খোঁজেন, তাহলে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্য। প্রথমেই পড়ার সময় ঘুম আসার রহস্যটা উদঘাটন করতে হবে।

পড়তে বসলে ঘুম আসে কেন?

পড়ার সময় ঘুমিয়ে পড়ার একটি কারণ হলো বই পড়া অবস্থায় আমাদের শরীরের বেশিরভাগ অংশই শিথিল থাকে এবং শুধুমাত্র চোখ ও মস্তিষ্ক কাজ করে। বইয়ের পাতায় প্রতি মুহূর্তে চোখকে বাম থেকে ডানে এবং ডান থেকে বামে ঘোরাতে হয়। মস্তিষ্কে শব্দ, বাক্য কিংবা অনুচ্ছেদগুলো জমা রাখতে হয়। শব্দগুলোর অর্থ অনুধাবন করতে হয়। অধ্যয়নের সময় এই বাড়তি চাপগুলো একটি চ্যালেঞ্জ। এভাবে কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে মস্তিষ্ক দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে। তখন চোখ ও মস্তিষ্ক উভয়েরই বিশ্রামের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাইতো ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে এবং মস্তিষ্কে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হতে থাকে।

আবার দেখা যায় যে, অনেকেই পড়ার সময় একটি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে নিতে চায়। কেউ শুয়ে শুয়ে পড়ে নয়তো বিশ্রামের ভঙ্গিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে পড়ে। তখন এমন আরামদায়ক পরিস্থিতিতে মস্তিষ্ক ধরেই নেয় এখন সময় কেবল বিশ্রামের। ফলে ঘুম চলে আসে।

পড়ার সময় ঘুম তাড়ানোর কার্যকরী উপায়

১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পড়ার সময় আপনি ঘুমিয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হল আপনি পর্যাপ্ত পানি পান করছেন না। তবে একটি গবেষণার হিসাবে, ডিহাইড্রেশন আক্ষরিকভাবে আপনার মস্তিষ্ককে সঙ্কুচিত করতে পারে! পড়ার সময় পর্যাপ্ত পানি না পান করলে আপনি মনোযোগ হারাতে পারেন। এটি মোকাবেলা করতে, আপনার পড়ার টেবিলে সবসময় ঠান্ডা পানির একটি বোতল রাখুন এবং সারা দিন একটু একটু করে চুমুক দিন। এতে মস্তিষ্ক আর্দ্র থাকে, যা পড়া বুঝতে ও মনে রাখতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিদিন ২ লিটার পানি পান করা উচিৎ।

২. প্রয়োজন ভালো ঘুম

পড়াশোনার সময় ঘুম আসার একটি বড় কারণ হলো রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতি রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমানো বাধ্যতামূলক। ঘুমের ঘাটতি থাকলে শরীর ও মন ফ্রেশ থাকবে না। কোনো কাজে ভালোভাবে ফোকাস করতে পারবেন না। আর পড়ার সময় তো চোখ ভর্তি ঘুম থাকবে। ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বলার কারণে আবার অতিরিক্ত ঘুমানোর কথা ভাববেন না, কিন্তু কম ঘুমালেও চলবে না। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। এর ফলে প্রতিরাতে একই সময়ে ঘুম আসবে আপনার।

৩. খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার

পড়াশোনার সময় নিজেকে ঘুমিয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে, পুষ্টি এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। সালাদ, মসুর ডাল এবং প্রচুর ফল ও শাক-সবজি সমৃদ্ধ একটি সুষম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকা তৈরি করুন। যেসব খাবারে মেদ বেশি থাকে তা আমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং অলস করে ফেলে। তবে চর্বিযুক্ত প্রোটিনগুলি শক্তির জন্য দুর্দান্ত।

৪. পাওয়ার ন্যাপ নিন

পড়তে পড়তে যখনই আপনার খুব ঘুম চলে আসবে, তখনই কিছুক্ষণ বিরতি দিন এবং ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি পাওয়ার ন্যাপ নিয়ে নিন। পরীক্ষার সময় রাতে যদি প্রয়োজনীয় পরিমাণে ঘুম না হয় তবে আপনাকে দিনের বেলায় একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। এই ঘুম আপনাকে জেগে ওঠার পরে পড়ায় মনোযোগ দিতে সহায়তা করবে।

৫. টেবিল থেকে উঠুন এবং কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করুন

পাওয়ার ন্যাপ নেয়া ছাড়াও পড়াশোনার সময় আপনি যদি ঘুম অনুভব করেন তাহলে কিছুক্ষণের জন্য পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি বাইরে গিয়ে ১০ মিনিটের জন্য ঘুরে আসতে পারেন। বাইরের নির্মল হাওয়া আপনাকে সতেজ করে দিতে পারে। আবার আপনি আপনার ঘরে হেঁটে হেঁটে বই নিয়েও পড়াশোনা করতে পারেন।

৬. একটানা দীর্ঘক্ষণ পড়া যাবে না

অনেকেই একটানা ৫-৬ ঘণ্টা পড়ার কথা বলে তবে মনোযোগ না হারিয়ে এতো দীর্ঘ সময় বই পড়া অসম্ভব। একটানা সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টার বেশি পড়া উচিত নয়। প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর ২০ মিনিটের জন্য বিরতি নিতে হবে। এই সময়ে আপনি একটু হাঁটাহাঁটি করবেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন।

৭. ঘন ঘন মুখ ধোয়া

জেগে থাকার সর্বাধিক ব্যবহারিক ও পরীক্ষিত একটি উপায় হলো যখনই ঘুম পাচ্ছে তখনই মুখ ধুয়ে নেয়া। এটি সম্ভবত অভিভাবকরা সবচেয়ে বেশি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যখনই চোখে ঘুম ঘুম ভাব আসবে তখনই ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

৮. শব্দ করে পড়া এবং পড়ার সময় লেখা

জোরে জোরে পড়া মনে মনে পড়ার চেয়ে অনেক অনেক ভালো। এ ছাড়া একটি খাতা আপনার পাশে রাখুন। যা পড়ছেন তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে রাখতে পারেন। কারণ এতে শরীর বেশি ব্যস্ত থাকবে। ফলে এটা পড়ার সময় না ঘুমাতে সাহায্য করবে।

৯. পড়ার বিষয়গুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পড়ুন

কখনও কখনও একই বিষয় খুব দীর্ঘ সময় পড়লে মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয় না, ফলে ঘুম চলে আসে। পড়তে পড়তে ঘুম এলে বিষয় পরিবর্তন করে অন্য কোনো বিষয় পড়ুন। বিশেষ করে পড়ার সময় ঘুম চলে আসলে আপনার পছন্দের ও আগ্রহের বিষয়টি পড়বেন, তাহলে দেখবেন ঘুম উধাও হয়ে গেছে।

১০. পড়ার সময় আরাম করা যাবে না

পড়াশোনার সময় ঘুমিয়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা। এ ক্ষেত্রে বিছানায় পড়াশোনা না করা উচিত। গা এলিয়ে বিশ্রামের সাথে পড়তে থাকলে মস্তিষ্ক ভাববে এটা আপনার বিশ্রামের সময়, একারণে ঘুম চলে আসবে। পড়ার জায়গা এবং ঘুমানোর জায়গা আলাদা রাখুন। ফলে মস্তিষ্ক দুটির মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে।

১১. নিজের সঙ্গে কথা বলুন

পড়ার সময় ঘুম তাড়ানোর কার্যকরী উপায় গুলোর মধ্যে নিজের সঙ্গে কথা বলা অন্যতম। নিজের সঙ্গে কথা বলাটাকে আপনার কাছে পাগলামির মতো শোনাতে পারে, তবে এটি সত্যিই কার্যকর। নিজেকে জাগ্রত রাখতে পড়াশোনার সময় নিজের সঙ্গে কথা বলুন। যেমন ধরুন নিজেকেই জিজ্ঞাসা করুন- ‌”তাহলে এখন আমি কী পড়াশোনা করব?”

উত্তর ভেবে নিজেকেই আবার বলবেন – ‘এখন আমি রসায়ন পড়তে পারি।’

এরপর আপনি নিজেকেই নিজে মোটিভেট করতে থাকবেন। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস এবং সাহস বাড়বে।

নিজেকে বলুন – আমি আগামীকাল পরীক্ষায় টেক্কা দিতে যাচ্ছি! আমি খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। নিশ্চিতভাবে ৯০+ নম্বর পাবো‌।

১২. চুইংগাম খেতে পারেন

চুইংগাম আপনার দাঁতগুলোর জন্য খুব খারাপ, তবে আপনার পড়ার সময় একটি প্যাকেট আপনার সাথে রাখতে পারেন এবং ঘুম এলে এটি চিবোতে পারেন। আপনার মুখ যদি অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে, তবে পড়ায় মনোযোগ হারানোর ঝুঁকি কম রয়েছে।

১৩. ক্যাফিনেটেড পানীয়

কফি বা অন্যান্য পানীয় পান করতে পারেন। এটি শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। মনে রাখা জরুরী যে, খুব বেশি ক্যাফেইন শরীরের পক্ষে খারাপ। এক দিনে ৫০০-৬০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন কখনোই পান করা উচিত নয়।

আশা করি এই পরামর্শ গুলো আপনাকে আপনার পরীক্ষার জন্য পড়ার সময় আপনাকে জেগে থাকতে সাহায্য করবে। শুধু পরীক্ষার সময় নয় এই পরামর্শ আপনার প্রতিদিনের পড়ার সময় কাজে লাগান। নিয়মিত রুটিনমাফিক পড়াশোনা করুন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিলেবাস সম্পন্ন করুন। এর ফলে পরীক্ষার সময় আর কোনো বাড়তি চাপ থাকবে না।

আরো পড়ুন: স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায়

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker