যেসব খাবারে ঘুম ভালো হয়

সুস্বাস্থ্যের জন্য রাতের গভীর ঘুম খুব প্রয়োজনীয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী লোকদের প্রতিরাতে ৭-৯ ঘণ্টা টানা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের সমস্যা হওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে অনেককিছুই। আজকাল সবার মধ্যে অনেক ধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করে। কারও শারীরিক সমস্যা, কারও আর্থিক। সব মিলিয়ে পড়ে মানসিক চাপ। সেই চাপ সামলে ঘুম নিয়ে আসা সহজ কাজ নয়। এদিকে ঘুম কম হলে বা অনিয়মিত হলে তার প্রভাব পড়ে শরীরে। প্রতিদিনের জীবনযাপন হয় বিঘ্নিত। কাজে মন বসে না, সারাক্ষণ খিটিমিটি লাগে। এমন সমস্যায় অনেকে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন ঘুমের ওষুধের ওপরে। যা শরীরে পার্শপ্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। যেসব খাবারে ঘুম ভালো হয় সেগুলো সম্পর্কে আজ জানাবো।

১. দুধ

অনেকেই রাতে ঘুমানোর আগে দুধ পান করেন। এটা তাদের জন্য বেশ আরামদায়ক বলেও জানা যায়। ঘুমানোর আগে কুসুম গরম, গরম কোকোয়া যুক্ত অথবা হলুদ মেশানো দুধ পান করা যায়।

নিউ ইয়র্ক’য়ের পুষ্টিবিদ টবি অ্যামিড ইটদিস নটদ্যাট ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “রাতে দুধ পান আরামদায়ক ও মানসিক চাপ কমায়। যদিও এর কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এতে থাকা পুষ্টি উপাদান রাতে ঘুমানোর আগে গ্রহণ করা শরীরকে প্রশান্ত করে। ফলে ঘুম তাড়াতাড়ি পায়।”

টেক্সাসের আরেক পুষ্টিবিদ এমি গুডসন বলেন “দুধ উচ্চ মানের প্রোটিন সমৃদ্ধ। অর্থাৎ এটা অ্যামিনো অ্যাসিডের ভালো উৎস। দুধের প্রাথমিক প্রোটিন যৌগ ‘ক্যাসিন’ থাকে (৮০ শতাংশ দুধের প্রোটিন), যা ধীরে হজম হয়। ফলে অনেকক্ষণ পেট ভরা রাখে আর সহজে ঘুম আসে।”

দুধ পান ঘুমের ব্যঘাত কমায়। এতে আছে ট্রিপটোফ্যান, যা ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন নিঃসরণ করে।

রাতে ঘুমেনোর আগে এক গ্লাস দুধ পান কেবল পেট ভরা রাখে না বরং তা ১৩টি অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।

২. সাদা ভাত

ভাত বলতে আমরা সাধারণভাবে সাদা ভাতকে বুঝি, যা আমাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর কারণে ঘুম ভালো হয়।

৩. বাদাম

বিভিন্ন ধরনের বাদামের অনেক উপকারিতা রয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু এটি ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে এই বিষয়টি অনেকের কাছেই অজানা। স্বাস্থ্যকর ফ্যাটে পরিপূর্ণ বাদামে রয়েছে ট্রিপটোফিন ও ম্যাগনেশিয়াম যা আমাদের মাংস পেশিকে ও স্নায়ুর কার্যকারিতাকে বৃদ্ধি করে এবং আমাদের হৃদযন্ত্রের ছন্দকে স্থির রাখে। আর গবেষকদের দাবি, বাদাম ঘুমের মান বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। কারণ হলো বাদাম মেলাটোনিন হরমোনের উৎস। আর মেলাটোনিন আপনার অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং আপনার শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সংকেত দেয়।

৪. তুলসি

তুলসি পাতার রস ঘুমের জন্য উপকারী। এতে হাইড্রা অ্যালকোহলিক এক্সট্র্যাক্ট ও এসেনসিয়াল অয়েল রয়েছে। নিয়মিত তুলসি পাতার রস খেলে অনিদ্রার সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

৫. মধু

মধু কিছুটা ইনসুলিন বাড়ায় এবং মস্তিষ্কে ট্রিপটোফ্যান সহজে যেতে সাহায্য করে। দেহঘড়ির হরমোন হিসেবে পরিচিত সেরেটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরি করে ট্রিপটোফ্যান, যা আমাদের ঘুম ও জেগে ওঠার চক্র ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী। ঘুমের আগে এক চামচ মধু খেলে কিংবা হারবাল চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে আরও প্রশান্তির ঘুম আসবে।

৬. ক্যামোমাইল চা

ক্যামোমাইল ডেইজি ফুলের মতোই ‘অ্যাস্টেরেসিয়া’ ভেষজ পরিবার বর্গের অন্তর্গত যা বহু বছর ধরেই প্রাকৃতিকভাবে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ হ্রাস, ঠাণ্ডার সমস্যা এবং অনিদ্রা দূর করতে সহায়তা করে।

গুডসনের মতে, “ক্যামোমাইল নির্যাস যুগে যুগে প্রশান্তিদায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যামোমাইল চা ঘুমের মান উন্নত করে এবং ঘুমের অভাবে হওয়া শারীরিক সমস্যার লক্ষণ কমাতে সহায়তা করে। এছাড়াও এর নির্যাস অনিদ্রা দূরে প্রভাব রাখে বলে জানা যায় অনেক গবেষণা থেকে।”

৭. ল্যাভেন্ডার চা

ল্যাভেন্ডার তার সুগন্ধের জন্য বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয়। এর সুগন্ধ মন ভালো রাখে।

‘ওয়ার্ল্ডভিউস অন এভিডেন্স-বেইজড নার্সিং’ জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে, একই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ল্যাভেন্ডার চা হতাশা এবং দুর্বলতা বিশেষত, প্রসবের পরে নারীদের দুর্বলতা কাটাতে ভূমিকা রাখে।

ঘুমের গুণগতমান, ক্লান্তি ও বিষণ্নতা দূর করতে ল্যাভেন্ডার চায়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করার জন্য এবং প্রসবোত্তর সময়ের প্রথম দিকে মাতৃ-শিশুর সংযুক্তির উন্নতিতে এই গবেষণা তাইওয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স কাউন্সিল’য়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।

৮. পিপারমিন্ট চা

ঐতিহ্যগতভাবে পিপারমিন্ট ওষুধ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। এতে অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিঅ্যালার্জিক উপাদান রয়েছে। এটি ভালো ঘুমের ক্ষেত্রেও খুব উপকারী। পিপারমিন্ট চা বানানো খুব সহজ। দুই কাপ পানি গরম করে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পিপারমিন্ট পাতা ছেড়ে দিলেই চা তৈরি হয়ে যাবে।

৯. টার্ট চেরি

মিষ্টি চেরি থেকে টার্ট চেরির একটি আলাদা স্বাদ রয়েছে। কখনো কখনো একে টক চেরিও বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রিচমন্ড, মন্টমোরেন্সি ও ইংলিশ মোরেলোর মতো জাত। যাঁরা টার্ট চেরির জুস পান করেন, তাঁদের জন্য বেশ কিছু গবেষণায় ঘুমের উপকারিতা পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন এক থেকে দুই কাপ টার্ট চেরির জুস পান করেন, তাঁদের মোট ঘুমের সময় ও ঘুমের দক্ষতাও বেশি। টার্ট চেরিতে মেলাটোনিনের গড় ঘনত্ব বেশি থাকায় এই হরমোন ঘুমের জন্য উপকারী। অন্যদিকে অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের প্রভাব বেশি থাকায় ঘুমের জন্য সহায়কও হয়।

১০. কলার জুস

বিছানায় যাবার আগে দারুণ পানীয় কলার জুস। এটি খুবই সুস্বাদু ও তৈরি করা খুবই সহজ। চমৎকার সুস্বাদু ও সুস্বাস্থ্যকর কলার জুস যেভাবে তৈরি করা যায়

একটি পাকা কলার অর্ধেক নিন। তাতে টেবিল চামচ বাদামের মাখন ও আধা কাপ সয়া সস মেশান। এরপর তা ভালোভাবে নেড়ে খেয়ে ফেলুন। অতপর ঘুমাতে যান। কখন যে ঘুম আসবে তা আপনি টেরই পাবেন না। যাদের ঘুম আসে না সকালে উঠে তারা বলতে বাধ্য হবেন, আজ বেশ ঘুম ঘুমিয়েছি।

১১. কাজু ও দুধ

যেসব খাবারে ঘুম ভালো হয় সেগুলোর মধ্যে কাজু ও দুধ অন্যতম। কাজু একটি বিশেষ শ্রেণীর বাদাম, যা খাদ্য আঁশ, ভিটামিন ও মিনারেলে পরিপূর্ণ। আস্ত আলমন্ডও ঘুমের গভীরতা বাড়াতে পারে, তবে দুধের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটালে এর কার্যকারিতা বাড়ে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুমের সমস্যা আছে প্রতিদিন ১০টি কাজু খেলে দুই সপ্তাহে তাদের সমস্যা ৮.৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।

স্বাস্থ্য থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker