পুষ্টি গুনে অনন্যা

পুষ্টিগুণ ও উপাদেয় কোনো খাবারের কথা বললে কোনটির নাম বলবেন? যদি বলি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে এমন একটি খাবারের যা অসংখ্য রোগ হতে পরিত্রাণ দেয় তাহলে? শুধু যে খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয় তা কিন্তু নয়, এটি একইসাথে পুষ্টি গুনে অনন্যা এবং ওষুধি গুনেও সমৃদ্ধ! আবার স্বাদের ক্ষেত্রেও অতুলনীয় ঠিক যেনো মধু!

হ্যাঁ, এই মধুই হচ্ছে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ উপাদেয় খাদ্য যা কিনা খাবার এবং ওষুধ উভয় কাজেই ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে বললে মধু হলো লাখ লাখ মৌমাছির অক্লান্ত শ্রম আর সেবাব্রতী জীবনের দান। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের রেণু ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করে জমা রাখে মৌচাকের প্রকোষ্ঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটা মৌমাছি থেকে কিভাবে কোন খাদ্য কিংবা ওষুধি সৃষ্টি হতে পারে? কি আছে এই মধুতে যার পুষ্টিগুণের এত চর্চা?

মধু হল এক প্রকারের মিষ্টি ও ঘন তরল পদার্থ, যা মৌমাছি বিভিন্ন ফুলের নির্যাস সংগ্রহ করে পাকস্থলীতে জমা করে। তার পর মৌমাছির লালার সাথে এই নির্যাসের জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় এই উচ্চ ঔষধিগুণ সম্পন্ন ভেষজ তরল।

মিষ্টি স্বাদের ক্ষেত্রে চিনি সুপরিচিত তবে চিনিতে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ আমাদের নানাবিধ শারীরিক সমস্যার কারণ। আবার বাড়তি ওজন এর আরেকটি সমস্যা। এ ক্ষেত্রে মধু অত্যন্ত নিরাপদ ও মিষ্টি স্বাদের হওয়ায় চিনির পরিবর্তে অনায়াসে মধুর ব্যবহার করা যায়।তাছাড়া মধুতে আছে ভেষজ উপাদান। মধুর এই ওষধি গুনের কারণ হলো মধুতে থাকা প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান। ফুলের পরাগের মধুতে রয়েছে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ, মন্টোজ এর মতন খাদ্য উপাদান যা শরীরকে সতেজ করে। এছাড়াও থাকে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, খনিজ লবণ ও ক্যালরি যা বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষমতা বাড়ায়। তবে মধুতে প্রোটিন ও চর্বি নেই বলে ওজন বাড়ার দুশ্চিন্তাও নেই।

মধুর ঔষধি গুণ রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায় এবং নানাবিধ রোগ প্রতিকারে বেশ কার্যকরী। মধু দেহে তাপ ও শক্তি জুগিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে।এছাড়া হজমে সহায়তা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরনে, ফুসফুসের যাবতীয় রোগ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময় সহ হাঁপানি রোগ নিরাময়ে, উচ্চরক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে, দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে, হাড় ও দাঁত গঠনে, তারুণ্য বজায় রাখতে, অনিদ্রা দূরীকরণে, পানিশূন্যতা দুর করতে, রূপচর্চা ও ওজন কমাতে, রক্তশূন্যতা দূরীকরনে, শীতের ঠান্ডায় শরীরকে গরম রাখতে রাখতে মধু কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এছাড়া কণ্ঠস্বর ভালো করার ক্ষেত্রে ও মধুর ব্যবহার ব্যাপক।

মধু যে বর্তমানেই এত জনপ্রিয় তা নয়। প্রাচীন কালেও এর ব্যবহার বিদ্যমান এবং এর ধর্মীয় ব্যাখ্যাও রয়েছে। প্রাচীন গ্রীক ধর্মে, জিউস এবং অলিম্পাসের বারো দেবতার খাদ্য ছিল অমৃত যার বর্তমান নাম মধু।

হিন্দু ধর্মের পঞ্চামৃতের মধ্যে মধু একটি। মন্দিরে মধু অভিষেক নামক একটি রীতিতে দেবতাদের উপর মধু ঢেলে দেওয়া হয়। বেদ এবং অন্যান্য প্রাচীন সাহিত্যে মধুর ব্যবহার একটি মহাঔষধি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মেও মধুর কথা উল্লেখ রয়েছে। আরবি পরিভাষায় মৌমাছিকে ‘নাহল’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনে এই নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা বিদ্যমান আছে। সূরা নাহল এর আয়াত নং ৬৯ বলা আছে –

“তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার।” তাছাড়া মধু ছিল হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর প্রিয় খাদ্যের মধ্যে একটি। মধু ওষুধ এবং খাদ্য উভয়ই হওয়ায় মধুকে বলা হয় – বিররে এলাহি ও তিব্বে নব্বী। অর্থাৎ খোদায়ী চিকিৎসা ও নবী করীম (সা.)- এর বিধানের অন্তর্ভুক্ত। সূরা মুহাম্মদ- এর ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন “জান্নাতে স্বচ্ছ মধুর নহর প্রবাহিত হবে।”

মধুর স্বাদ ও গুণাগুণ নিয়ে যত বলা যাবে ততই কম। তবে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ফল ও ফুলের কারণে এর স্বাদেতারতম্য বিদ্যমান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধু তার স্বাদ, রং, হালকা সুগন্ধ এবং ঔষধি গুণাবলীর জন্য প্রসিদ্ধ। সুন্দরবনের বেশিরভাগ মধু কেওড়া গাছের ফুল থেকে উৎপন্ন। মধুর অন্য একটি গুণ হল এটি কখনো নষ্ট হয় না৷ এক কথায় মধু হলো অতুলনীয় আর ভেষজ গুণ এবং পুষ্টি গুনে অনন্যা।

স্বাস্থ্য থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker