অদ্ভুত মস্তিষ্কের বিচিত্র কথা

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। কঠিন থেকে কঠিন অঙ্ক কষা কিংবা সৌরজগতে নতুন গ্রহ আবিষ্কার করা থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশ থেকে মুক্ত খোঁজা কিংবা গহীন বনের রহস্য ভেদ করা, সবই যেনো মানুষের কাছে বাম হাতের কাজ। কিন্তু এত সব অসাধ্য সাধনের পেছনে কিন্তু মানুষ নেই বরং রয়েছে সৃষ্টিকর্তার নিপুণ কর্ম, মানবদেহের বস, আমাদের মস্তিষ্ক। আমাদের দেহের গতিবিধি থেকে শুরু করে নিঃশ্বাস অব্দি সবই এই মস্তিষ্কের হাতে। আজ আমরা আলোচনা করবো অদ্ভুত মস্তিষ্কের বিচিত্র কথা।

মস্তিষ্ক নিয়ে কথা হচ্ছে আর আলবার্ট আইনস্টাইনের মাথা বাদ যাবে তা কি করে হয়? বলুন তো আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের আকার সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের আকারের মতোই সমান ছিলো তবুও আমি আর আপনি আইনস্টাইন নই কেন? আসলে মস্তিষ্কের যে অংশ গণিত এবং তৎসংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত, আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের সেই অংশের আকার ভিন্ন ছিল, যা প্রায় ৩৫ ভাগ চওড়া ছিল সাধারণ মানুষের তুলনায়। বুঝলেন তো, মস্তিষ্ক থাকলেই আইনস্টাইন হওয়া যায়না!

মস্তিষ্ক নিয়ে যখন কথাই হচ্ছে আপনি কি জানেন সবচেয়ে পুরনো মস্তিষ্কও সংরক্ষণ করা আছে। ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০০০ বছর পুরানো মস্তিষ্কের সন্ধান পাওয়া গেছে।এছাড়াও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭০০০ মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করা আছে। এতো মস্তিষ্ক সংরক্ষণের কারণ কি জানেন?

সৃষ্টি কর্তার সবচেয়ে অদ্ভুত ও নিপুণ সৃষ্টি আমাদের মস্তিষ্ক। পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন এক নয় তেমনি সবার মস্তিষ্কও এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন কাজ ও বিচিত্র চিন্তা ক্ষমতার কারণেই মূলত এই বৈচিত্রতা।

আমাদের সকল চিন্তা-ভাবনা এবং কার্যক্রম পরিচালিত হয় মস্তিষ্ক থেকে। অসংখ্য নিউরন এবং হরমোনের সমন্বয়ের মাধ্যমে এই কাজগুলো সম্পন্ন হয়। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সামনের অংশ স্ফীত হয়ে করোটিকা বা খুলির মধ্যে মস্তিষ্ক গঠন করে। করোটিকার ভেতরে মেনিনজেস নামক পর্দা দ্বারা মস্তিষ্ক আবৃত থাকে। এই মস্তিষ্কই আমাদের শরীরের বস হিসেবে কাজ করে।

মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের বস কেন জানেন কি ? তার আগে চলুন জানি মস্তিষ্ক কিভাবে গঠিত।

মস্তিষ্কের ভাগ ৩টা:

(১) অগ্রমস্তিষ্ক (Forebrain or Prosencephalon)

(২) মধ্যমস্তিষ্ক (Midbrain or Mesencephalon)

(৩) পশ্চাৎমস্তিষ্ক (Hindbrain or Rhombencephalon)

মস্তিষ্কের অগ্র ভাগ সেরেব্রাম, হাইপোথ্যালামাস এবং থ্যালামাস দ্বারা গঠিত। আমাদের চিন্তা ক্ষমতা কিংবা কোনো জটিল কাজের সমাধানের কাজ করে সেরেব্রাম অংশ যাকে বলে মস্তিষ্কের থিংকিং পার্ট।

চোখ, কান, নাক, আঙ্গুল প্রভৃতি অঙ্গ থেকে আসা উদ্দীপনাকে কর্টেক্সে পাঠানো এবং ফিডব্যাক গ্রহন করার কাজটা করে থ্যালামাস। মূলত এই অংশ আমাদের আবেগ, অনুভূতির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। তাই একে মস্তিষ্কের ইমোশনাল পার্ট বলা হয়।

অগ্র মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশটি পিটুইটারি গ্রন্থির সাথে যুক্ত থাকে। এটি স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে৷ অর্থাৎ ক্ষুদা, তৃষ্ণা, ঘুম, রাগ, ভালোলাগা, উদ্বেগ, দেহতাপ প্রভৃতির নিয়ন্ত্রক এই অংশ। আমরা যে গরমকালে ঘেমে একাকার হয়ে যাই আবার শীত কাল এলে ঠান্ডায় কাপতে থাকি এসব কিছুর সংকেত দেহকে পাঠায় হাইপোথ্যালামাস।

এর পর আসি মস্তিষ্কের মধ্যভাগে – এই অংশটি মূলত অগ্র মস্তিষ্ক আর পশ্চাৎ মস্তিষ্কের মাঝে সেতু হিসেবে কাজ করে। আমাদের চোখে দেখা আর কানে শোনার কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে এই অংশ।

এবার আসা যাক মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে – সেরেবেলাম, পনস ও মেডুলা অবলংগাটা নামক ৩টি অংশ নিয়ে গঠিত।

সেরেবেলাম কে মস্তিষ্কের ভিতরে ছোট মস্তিষ্কও কারন এটি কর্টেক্সের সংক্ষিপ্ত ভার্সন। এটি ভারসাম্য রক্ষা, হাঁটা চলা কিংবা দৌড়ানো ইত্যাদি কাজের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।

পনস সেরেব্রাম, সেরেবেলাম এবং স্পাইনাল কর্ডের মধ্যে রিলে স্টেশন হিসেবে কাজ করে। আমাদের স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রকের কর্মভার এই অংশ পালন করে।

শেষটা হলো মেডুলা অবলংগাটা, যা স্পাইনাল কর্ডের উপরে অবস্থান করে এবং হৃৎস্পন্দন, শ্বসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

এখন বলুন তো মস্তিষ্ক যখন পুরো দেহ টাকেই নিয়ন্ত্রণ করে তাকে কি বস বললে ভুল হবে? মস্তিষ্ক যে কেবল এই কাজেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়, আমাদের আরো কিছু বিশেষ তথ্য জানা এখনও বাকি।

আচ্ছা বলুন তো সবচেয়ে বড়ো প্রাণী কোনটি? হাতি তাইনা। তার ব্রেইনটাও বড়ো হাওয়ার কথা ঠিক না? কিন্তু হাতির মস্তিষ্ক তার পুরো ওজনের মাত্র ০.২৫ ভাগ কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক তার পুরো ওজনের ২ ভাগ। বলা বাহুল্য, হাতি আকারে যতই বড় হোক প্রকৃত অর্থে মানুষই বড়।

আরেকটা তথ্য শুনলে আপনি ঠিকই চমকে যাবেন, আমরা মোটা হলে কি ভাবি শরীরে চর্বি জমেছে তাইনা? কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক দেহের সবচেয়ে চর্বিবহুল অংশ কিন্তু সে মোটা হয়না বরং ১৮ বছরের পর মস্তিষ্ক আর বৃদ্ধি পায়না। মানব শরীরে পানি আর অক্সিজেন দুটোই বিদ্যমান। আর মজার বিষয় হলো ৭৫ ভাগ পানি আর ২০ ভাগ অক্সিজেন মস্তিষ্ক একাই ব্যবহার করে। আমাদের মস্তিষ্ক ৪ থেকে ৬ মিনিট অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে এবং তারপর মারা যেতে থাকে। ৫ থেকে ১০ মিনিট অক্সিজেন না থাকলে মস্তিষ্কের স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়। আবার শরীরের ২০ ভাগ রক্তই মস্তিষ্ক আদান প্রদান করে, যে কারণে মস্তিষ্ক যদি ৮ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে রক্ত না পায়, তবে মানুষ জ্ঞান হারায়।

আরেকটা ব্যাপার কি জানেন ১০৪ ডিগ্রি জ্বর হলেই আমাদের অবস্থা নাজেহাল হয়ে যায়, মনে হয় গা পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু মস্তিষ্ক ১১৫.৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা পর্যন্ত সহ্য করতে পারে এবং সে পর্যন্ত মানুষ বেচেঁ থাকতে পারে তবে এর বেশি হলে মৃত্যু আসন্ন।

জ্বরের কথা যখন হচ্ছেই, মাথা ব্যথার সাথে পরিচিত আছেন নিশ্চয়ই? কিন্তু জানেন কি মস্তিষ্কে ব্যথা অনুভব হওয়ার মত কোনো অঙ্গ নেই অর্থাৎ মাথা ব্যাথা হয় ঠিকই কিন্তু এটার জন্য মস্তিষ্ক নয় বরং দেহের অন্য কোনো অঙ্গ দায়ী। যদিও ব্যথা অনুভব হাওয়ার অংশ নেই কিন্তু কান আছে। মস্তিস্কের আবার কান হয় নাকি? না, প্রকৃত অর্থে কান না কিন্তু মস্তিষ্ক কানে শোনা জিনিস দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আওয়াজ করে পড়ে তাদের পড়া দীর্ঘ সময় মনে থাকে। মস্তিস্কের আরেকটা চমকপ্রদ গুণ হলো, আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের স্পর্শ চেনে। অর্থাৎ আপনি নিজে নিজেকে কাতুকুতু বা সুড়সুড়ি দিতে পারবেন না কারণ আপনার মস্তিষ্ক আপনার স্পর্শ এবং অন্য কারও স্পর্শের পার্থক্য করতে পারে।

এইবার একটা মজার কথা বলি। ভালোবাসা শব্দটা বেশ আবেগের তাই না। অনেকে তো ভালোবাসার জন্য প্রাণও দিয়ে দেয়। কিন্তু যদি বলি আপনি কখনো কাউকে ভালোবাসেননি আবার আপনাকেও কেউ কোনো দিন ভালোবাসেনি এটি কেবল মস্তিষ্কের একটি বিশেষ হরমোনের কারসাজি। আমাদের যখন কাউকে ভালোলাগে কিংবা কারো প্রতি আবেগ জন্মায়, তখন আমাদের মস্তিষ্কে থাকা অক্সিটোক্সিন নামক হরমোন মস্তিষ্ক থেকে ক্ষরিত হয় যা ভালোবাসা এবং আত্মসংবরণের জন্য দায়ী। যে ভালোবাসার জন্য প্রাণ দিয়ে দিচ্ছেন সেটি আসলে মস্তিষ্কের হরমোনের নিঃসরণ, খুবই মর্মান্তিক তাইনা!

এখানেই শেষ না আপনি কি জানেন মস্তিষ্কে কারেন্ট বিদ্যমান কিন্তু তবুও আপনি শক খান না? তবে এই কারেন্ট সেই কারেন্ট না, যখন আমাদের মস্তিষ্ক জেগে থাকে তখন মস্তিষ্ক ১০ থেকে ২৩ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে যা দিয়ে একটি বাল্ব জ্বালানো সম্ভব। এখন আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে মস্তিস্ক দিয়ে বাল্ব জ্বালানোর চেষ্টা করবেন না কিন্তু!

হাই তুলতে দেখেছেন নিশ্চয়ই? ঘুম পেলেই যে মানুষ হাই তুলে না এমন না, বেশিরভাগ সময় হাই তুলতে দেখলেও হাই আসে, ( আপনার সাথেও কি এমন হয়েছে কিনা জানতে ভুলবেন না )

আসলে যখন আমরা কাউকে হাই তুলতে দেখি আমাদের মস্তিষ্কও একই সংকেত পাঠায় যে কারণে আমাদেরও হাই চলে আসে। কিন্তু এতে একটা উপকার আছে, একবার হাই তুললে মস্তিষ্কে অনেক পরিমাণে অক্সজেন সঞ্চালন হয় যা তাকে অধিক কাজ করতে সাহায্য করে। যতই হাই তুলেন আপনি ঘুমালেও আপনার মস্তিষ্ক কিন্তু ঘুমায় না। আপনার ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রক সর্বদা তার কাজেই ব্যস্ত থাকে কিন্তু মস্তিষ্ক না ঘুমালে আমরা সপ্ন কিভাবে দেখি?আসলে আমরা যা একনাগাড়ে চিন্তা করি বা যারা তাদের চিন্তাকে বিশ্বাস করে, তার সম্মুখীন হয় সে প্রায় ৭০,০০০ বার। বিশ্বাস হচ্ছে না তাই তো? গবেষণা মতে, একজন মানুষ ১-২ ঘণ্টা সপ্ন দেখে আবার অনেকে ৪-৭ ঘণ্টাও টানা সপ্ন দেখে। অনেকেই সপ্ন মনে রাখতে পারেনা তাই মনে করে তারা সপ্ন দেখে না, কিন্তু আসলে সব মানুষই সপ্ন দেখে। আচ্ছা সব তো হলো বলুন তো আমরা দিনে কত বার চোখের পাতা ফেলি? কোনো দিন গুনে দেখেছেন কি? একজন মানুষ দৈনিক প্রায় ২০,০০০ বার চোখের পাতা ফেলে, বিশ্বাস না হলে গুনে দেখতে পারেন।

দেখেছেন আগেই বলেছি সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত এবং বিচিত্র সৃষ্টি এই মস্তিষ্ক। কিন্তু এই মস্তিষ্কের পরিচর্চা না করলে আসতে আসতে মস্তিষ্ক ধীর গতির হতে থাকে, তখন সহজ কাজও বেশ কঠিন লাগে। তাহলে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য কি করতে পারি বলুন তো?

মস্তিষ্ক ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ভিটামিন ও মিনারেলস্ সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার থাকতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়াম করতে হবে। বইপড়া, সংগীত চর্চা, সমস্যা সমাধান করা, অঙ্কন করা প্রভৃতি চ্যালেঞ্জিং কাজের মাধ্যমে ব্রেনকে সক্রিয় রাখতে হবে। মস্তিষ্ক যত সচল থাকবে অতই কার্যকরী হয়ে উঠবে তবে অতিরিক্ত চাপ মস্তিষ্কে পড়লে হীতে বিপরীত হতে বেশি সময় লাগবে না তাই পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম কিন্তু আবশ্যক।

মানব মস্তিষ্ক স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রীয় অঙ্গ। এই মস্তিষ্ক মানবদেহের সিংহভাগ কার্যকলাপই নিয়ন্ত্রণ করে।আমাদের মস্তিষ্কে এক সাথে অনেক গুলি কোষ কাজ করছে অনায়াসে। ঘুমন্ত কিংবা সজাগ দুটি অবস্থাতেই এই অঙ্গটি চব্বিশ ঘণ্টাই সচল থাকে। গবেষকগণদের ধারণা প্রতিদিন একটি মস্তিষ্ক প্রায় ৭০ হাজার চিন্তা করে। অর্থাৎ মস্তিষ্ক সর্বদাই চিন্তাশীল। এক কথায় বলতে গেলে আমাদের মস্তিষ্ক বিচিত্র সকল গুনে গুন্নানিত এবং সাথে আমাদের দেহের অতন্দ্র প্রহরীও। জানা হয়ে গেলো অদ্ভুত মস্তিষ্কের বিচিত্র কথা।

স্বাস্থ্য থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker