'সাতকাহন' একটি নারীর অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের চিত্রায়ণের গল্প

বাংলা সাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি সমরেশ মজুমদার রচিত উপন্যাস ‘সাতকাহন’। এটি শুধু একটি উপন্যাসই নয়, ‘সাতকাহন’ একটি নারীর অপ্রতিরোধ্য জীবন-সংগ্রামের চিত্রায়ণের গল্প। অনেকেই একে সমরেশ মজুমদারের মাস্টারপিস বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন।

সাতকাহন উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র – দীপাবলী বন্দোপাধ্যায়, ডাকনাম দীপা। সুতরাং বলাই যায়, উপন্যাসটির সূচনা, প্রবাহধারা এবং পরিসমাপ্তির সম্পূর্ণটা জুড়েই আমরা ‘দীপা’ নামের নারী চরিত্রকে দেখতে পাবো।

আড়ংভাসা নদীর তীরের এক চা-বাগানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে দীপা। বাবা-মা-দুই ভাই আর ঠাকুমা কে নিয়ে আনন্দেই দিন কাটছিলো দীপার। তখনো সে ছিলো একজন সাধারণ, দুরন্ত, চপল বালিকা। ধীরে ধীরে বালিকা দীপা কৈশোরে পদার্পণ করতে থাকে।ঠিক তখনই জীবনের জটিলতা, কঠোর বাস্তবতা কিংবা পৃথিবীর অপ্রিয় সত্যিগুলোর সাথে তার পরিচয় ঘটতে শুরু করে। একটা সময় সে জানতে পারে, যে পিতা ‘অমরনাথ’ আর মমতাময়ী মাতা ‘অঞ্জলি’ তাকে ছোট থেকে বুকে আগলে রেখেছে, পরম মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে তারা তার জন্মদাতা পিতা-মাতা নন। সেই থেকে শুরু, এরপর ক্রমাগত অন্তহীন ঝড়, বহু বাধা-বিপত্তি, নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার সম্মুখীন হতে হয়েছে দীপাকে। চেনা জগতটা চটজলদি অচেনা হয়ে যায় দীপার। কিন্তু তবুও সে থেমে থাকেনি। নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছে নিজের সম্মান প্রতিষ্ঠার। নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে অর্জন করেছে সাফল্য কিন্তু সাফল্য অর্জনের এই পথ মোটেও সহজ ছিল না তার জন্য। প্রবল জেদ আর ইচ্ছাশক্তির আলো দিয়ে জীবন সংগ্রামে বারবার জয়ী হয়েছে। আর এই জয়ী হবার পেছনে যাঁর উপদেশ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে কিংবা আশার আলো দেখিয়েছে তিনি দীপাবলির ‘সত্যসাধন মাস্টারমশাই’। তাঁর বাণী, অমরনাথের ভালোবাসা, আর ঠাকুমা মনোরমার আশির্বাদ ছিল দীপাবলির চলার পথের পাথেয়। সকল শুভশক্তির জোরেই মাত্র ৭২ ঘণ্টার অভিশপ্ত বৈবাহিক জীবনের কালো অধ্যায়ের স্মৃতিগুলো মুছে দিয়ে ১০ বছর বয়সী ছোট্ট দীপাবলি হয়ে ওঠে একজন অসামান্যা নারী, ক্রমান্বয়ে চোখের রেখায় আঁকা স্বপ্নগুলো সত্যি করে তুলতে থাকে। ছোট্ট গ্রামে বেড়ে ওঠা দীপাবলি জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ভারতবর্ষের একজন সফল সরকারী চাকুরীজীবি হতে সমর্থ হয়। একজন নারী যে পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম না, তা দীপাবলি বুঝিয়ে দিয়েছে চোখে আঙুল দিয়ে। তবে কালের গর্ভে একটাসময় হারিয়ে যায় তার খুব প্রিয় মানুষগুলো। জীবনে সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হলেও প্রকৃত ভালোবাসার অভাব দীপাবলির জীবনে কিছুটা রয়েই গিয়েছিল।অতুল, অমল, শমিত, অর্জুন কিংবা অলোক কেউই দীপাবলি কে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারেনি অথবা চায়নি। শেষ মুহুর্ত পর্যন্তই দীপাবলি বড্ড একা হয়ে বেঁচেছিলো, আপন বলতে পাশে ছিলো শুধু ঠাকুমা মনোরমা।

দীপাবলি হলো সেই নারী যে নারীর আপোষহীন এবং দৃঢ়চেতা মনোভাবকে পুরুষশাসিত সমাজ কোনোভাবেই পরাস্ত করতে পারে না, হতাশার কালকুঠুরিতে ছুড়ে ফেলতে পারে না!দীপাবলিরা বারবার বিজয়ের মালা গলায় জড়িয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকতে শেখায়। তাইতো, প্রতিটি বাঙালি নারী বুকে অফুরান সাহস আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে চোখের রেখায় একজন দীপাবলি হবার স্বপ্ন আঁকে। এই উপন্যাস একজন নারীকে ভাবতে শেখাবে, জানতে শেখাবে, বাঁচতে শেখাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখাবে; সেইসাথে শেখাবে মানবিকতাও। শুধু তাই নয়, এই উপন্যাস পুরুষকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাবে, উদ্বুদ্ধ করবে বৈষম্যহীনতায়।

দীপাবলিকে যতই চেনা যায়, ততই অবাক হতে হয়; কখনো বা তাকে মনে হয় অতি চেনা এক নারী। বিংশ শতাব্দীর নারীদের চিন্তা যে কতটা আধুনিক ছিল, তা এই উপন্যাস না পড়লে হয়তো বুঝতে পারা যায় না। দীপাবলির এই আধুনিকতা দেখে হয়তো বর্তমানের অনেকের চিন্তা-চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এজন্যই বললাম ‘সাতকাহন’ একটি নারীর অপ্রতিরোধ্য জীবন-সংগ্রামের চিত্রায়ণের গল্প।

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker