টেলিফোনে মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়

মানুষ মারা গেলেও আমাদের কথা ফুরায় না। এক জীবন কেন সহস্র জীবন আসলেও হয়তো এ কথা কখনো ফুরাবে না। জানেনই তো প্রিয় মানুষের জন্য কথারা জমে থাকে মনের কোণে। এসব জমানো কথা বলার জন্য প্রহর প্রহর অপেক্ষাও করতে হয়। আমাদের কথাগুলো ফুরায় না কিন্তু মানুষগুলো ফুরিয়ে যায়। এখন যদি শোনেন, টেলিফোনে মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায় তাহলে আপনার বিশ্বাস হবে কী?

অলিম্পিয়া থেকে প্রায় চার মাইল দূরে, নির্জন বনের ভেতর বসানো হয়েছে পুরোনো দিনের একটি ভিনটেজ রোটারি ফোন। টেলিফোনের সাথে এর কোনো সংযোগ নেই। অথচ দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন এই ফোনের কাছে, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের সাথে কথা বলার জন্য। কারণ অনেক কথা রয়েছে যেগুলো প্রিয়মানুষ বেঁচে থাকাকালীন বলা হয়ে ওঠেনি।

ধারণাটি এসেছে মূলত জাপান থেকে। জাপানের ওটসুচি শহরের বাগান নকশাকার ইতারু সাসাকি ২০১০ সালে প্রথম এমন সংযোগবিহীন টেলিফোন বুথ তৈরি করেন। ফোনটির নাম দেওয়া হয় উইন্ড ফোন। বাতাসে ভেসে জমানো কথাগুলো পৌঁছে যাবে প্রয়াত প্রিয়জনের কাছে, এমন ধারণা থেকেই এই নামকরণ। ২০১১ সালের ভূমিকম্প ও সুনামিতে জাপানের তোহোকু শহরের চিত্রটা বদলে যায়। প্রাণ হারায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। তখন থেকেই এই উইন্ড ফোন হয়ে গেলো তাদের, যাদের প্রিয়মানুষ হারিয়ে গেছে কিন্তু অনেক কথা বলার বাকি। হাজারো মানুষ প্রতিদিন উইন্ড ফোনের কাছে ভিড় করতে থাকে। সাসাকির তৈরি এই টেলিফোন বুথ কতোযে কথপোকথনের সাক্ষী! উইন্ড ফোনের ধারণা থেকে পরে একাধিক উপন্যাস ও চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে।

২০২০ সালে অলিম্পিয়ার স্কুয়াক্সিন পার্কে উইন্ড ফোনটি বসিয়েছিলেন কোরে ডেমবেক। আকস্মিকভাবে চার বছর বয়সী মেয়েকে হারিয়ে ডেমবেকের এক বন্ধুর তখন পাগল দশা। বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতেই একটা পুরোনো ফোন কিনে এনে পার্কের একটি পুরানো-বর্ধিত সিডার গাছের সঙ্গে বেঁধে দেন তিনি। জানিয়ে দেন, ‘এই ফোনে তুমি তোমার মেয়েকে না বলা কথাগুলো বলতে পারবে। হয়তো মন কিছুটা শান্ত হবে।’ চার বছর বয়সী সেই মেয়েটির নাম ছিল জোয়েল রোজ সিলভেস্টার। জোয়েলের স্মরণেই পরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুয়াক্সিন পার্কে একটি ফোন বুথ বসানো হয়। জোয়েলের মা এরিন সিলভাস্টার বলেন, ‘ফোনের ওপাশ থেকে তো আর মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। তাই একা একা কথা বলতে গেলে আমার বুক ভেঙে যায়। তবু যখন কোনোভাবেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারি না, তখন এই ফোন বুথে আসি।’

এরপর লোকেরা ফোনটি জানতে পেরে দলে দলে এটি পরিদর্শন শুরু করে। পরবর্তীতে শহর এটিকে একটি অফিসিয়াল ইনস্টলেশন করার সিদ্ধান্ত নেয়। সংযোগহীন এই ফোন বুথের সামনে একটি ফলকে লেখা আছে, ‘যাঁরা কখনো না কখনো কোনো প্রিয়জন হারিয়েছেন, এই ফোনটি তাঁদের জন্য। এর মাধ্যমে আপনার হারানো বন্ধু বা স্বজনকে না বলা বার্তাটি পৌঁছে দিতে পারবেন।

ডেমবেকের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে অনেকেই এমন ফোন বুথ স্থাপন করছেন। টেলিফোনে মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলার আশায় উইন্ড ফোনের ওপর ভরসা করছেন অনেকে।

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker