কোন বিভাগে পড়বেন আপনি?

প্রতি বছর নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভাগ নির্বাচন নিয়ে নানা রকম মতের সৃষ্টি হয়। যার উপর নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার বা সবকিছু। “কোন বিভাগে পড়বে তুমি” এই সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে সবকিছু বিবেচনা করে। মনে রাখবে, সব বিষয়ই ভালো বিষয়। তবে তোমার যেটা ভালো লাগে, তুমি সেটা পড়ো। তাতে যদি তুমি ভালো করো, তুমি জীবনে অনেক ভালো করবে। কিছু লোকের ধারণা, মানবিক বিষয়গুলো খুবই সস্তা। এগুলো নিতান্তই মূর্খের কথা। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা মানবিক বিষয়গুলো পছন্দ করে কিন্তু নিতে পারছে না তাদের পরিবারের চাপে কিংবা লজ্জায়। মাথায় রাখবে, আজকের এ দুনিয়ায় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, না পড়লে শিক্ষিত হয় না। তোমার বাবা মা তোমার বিষয় পছন্দ করে দেওয়ার জন্য তাদের মতামত দিতে পারেন বড়জোর, কিন্তু চাপ নয়। কারণ পুরো জীবনটা তোমাকেই লড়ে যেতে হবে। বাবা-মা সন্তানের ভালো চায় তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু তাই বলে সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নেয়ার পক্ষে আমি নই।

আসলে আমাদের সন্তানদেরকে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার পরিবর্তে আমরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অনেক টাকা কামানোর কথাই বলছি বটে। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কিংবা একজন দার্শনিক ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে কোনো অংশে কম সম্মানের বলতে পারেন? শুধু তাই নয়, আমরা আমাদের সন্তানদের সবচেয়ে অধিক সম্মানের পেশা শিক্ষকতা, সেটাও হতে বলছি না। উল্টো বাজার দরের দিকে তাকিয়ে কোমলমতি সন্তানকে বারবার বাধ্য করছি বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসা শাখায় পড়াশোনা করতে। দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত বা সচেতন পরিবারগুলোর অবস্থাও প্রায় এমনই।

এই লেখাটি যদি কোনো বাবা-মা পড়েন তাহলে আমি আপনাকে বলছি, প্রচলিত সস্তা ধ্যান ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন। আপনার সন্তানের প্রতি সহনশীল হন। তাকে সাহায্য করুন। কোনোভাবেই মানসিক চাপ সৃষ্টি করবেন না।

আর যদি এই লেখাটি কোনো শিক্ষার্থী পড়ো, তোমার প্রতি আমার অনুরোধ এই যে, বিষয় নির্বাচন নিয়ে নিজে সঠিক সিদ্ধান্ত নাও। বাবা মাকে বোঝাও। আর বাইরে কে কী বললো তাতে কান দিও না।

যে প্রবলভাবে সাধনা করে, চেষ্টা করে, পরিশ্রম করে, খুব মনোযোগ দেয়, তার মেধাটাই কেবল প্রকাশিত হয়। তোমরা চাইলেই বড় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক কিংবা শিল্পী হতে পারবে। কিন্তু ওই বিষয়টা তোমার ভালো লাগতে হবে। তারপর সেই বিষয়ে তোমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। মনে রাখবে, সব সাবজেক্টই ভালো সাবজেক্ট। যদি তুমি ভালোভাবে পড়ো, তবেই ভালো করতে পারবে। ভালো ফলের দরকার আছে।

তবে আমরা অধিকাংশই সঠিক সময়ে বুঝতে পারি না যে, আমার আসলে কোন বিষয়টা ভালো লাগে। তবে কোনো একসময় বুঝতে পারি, আমার কী ভালো লাগে। বিজ্ঞান নাকি সাহিত্য, নাকি বাণিজ্য। আজকাল খুব বাণিজ্য পড়ার ঝোঁক এসেছে। কিন্তু সবার বাণিজ্য পড়ার দরকার নেই। বিজ্ঞান পড়লেও শুধু ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কম্পিউটারবিদ হওয়ার সাধনা করার দরকার নেই। মৌলিক বিজ্ঞানও পড়তে পারো।পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান পড়ে তুমি বড় বিজ্ঞানী হতে পারবে। ধরো একটা বিষয় আছে, ভূগোল। আমাদের ভালো ভূগোলবিদ খুব দরকার। পৃথিবীতে ভূগোলবিদের সম্মানও আছে, সম্মানীও তারা ভালো পান। কিংবা ধরো কেউ পারসী পড়ল, পারস্য-সাহিত্য অনুবাদ করল, তাতে আমরা সবাই কত উপকৃত হব!

উন্নত বিশ্বের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তোমাকে যখন ভর্তি করতে চাইবে, তখন কেবল তোমার ফল দেখবে না, তুমি আর কী কী করো, সংস্কৃতি বা সমাজসেবা, সেটাও কিন্তু খুব করে দেখবে।

তোমার যে সাবজেক্ট ভালো লাগে, তুমি সেই বিষয় নিয়ে পড়ো। তোমার যদি খেলতে ভালো লাগে, খেলোয়াড় হওয়ার চেষ্টা করো। যদি সাহিত্য ভালো লাগে, তুমি লেখক হওয়ার কথা ভাবতে পারো। তোমার যদি বিজ্ঞান ভালো লাগে, তুমি অবশ্যই বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। তোমার যদি বিজ্ঞান ভালো না লাগে, কবিতা পড়তে ভালো না লাগে, তুমি কমার্স নিয়ে পড়তে পারো।

এখন কথা হলো, যা-ই পড়ো না কেন, মন দিয়ে পড়তে হবে। ‘ও খুব ভালো সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছে, আমারটা তো ভালো সাবজেক্ট পেলই না’-এর চেয়ে বড় ভুল কথা বোধ করি আর নেই। সব বিষয়ই ভালো, যদি তোমার সেটা ভালো লাগে, আর তুমি সেটা মন দিয়ে পড়ো। কোন বিভাগে পড়বে তুমি এটা নিয়ে এতো জটিল জটিল চিন্তার কী আছে?

বাংলাদেশে প্রায় সবাই গণহারে কর্মাস বিভাগ পছন্দ করে। এর প্রধান কারণ বিজ্ঞানকে কঠিন মনে করা।

ছোট বেলায় কেউ যদি জিজ্ঞেস করত বড় হয়ে কি হবে বাবা? সবাই গণহারে বলত – ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা পাইলট ইত্যাদি ইত্যাদি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা পাইলট যায় হতে ইচ্ছে করে তা পছন্দ করার উপযুক্ত এবং এক মাত্র সময় হচ্ছে এই নবম শ্রেণি। তবে তা অবশ্যই কমার্স বা ব্যবসা শিক্ষা শাখা পছন্দ করলে হওয়া যায় না।ব্যবসা শিক্ষা পড়লেই বড় ব্যবসায়ী হওয়া যাবে এর কোনো মানে নেই। বেশির ভাগই চিন্তা করে পাশ করে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে বা ব্যাংকে জব করার।

ব্যবসা শিক্ষা শাখার মধ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য সাবজেক্ট তুলনামূলকভাবে কম এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও অনেক বেশি। পরে বিশাল একটা প্রতিযোগিতা করতে হয়। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনেকেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের বিষয়টি পড়তে পারে না। এবং শেষে দেখা যায় অনেকেই যেটা পছন্দের নয় এমন একটি বিষয় বা মানবিক শাখার একটি বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করতে হয়।বিজ্ঞান বিভাগে বিষয় সংখ্যা অনেক বেশি। পড়ালেখার সুযোগ বেশি। ভালো একটা ক্যারিয়ার তৈরির ও সুযোগ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। তা ছাড়া ছোট বেলার স্বপ্নগুলো সত্যি করার ও সুযোগ এ বিজ্ঞান বিভাগেই।

ব্যবসা শিক্ষা শাখায় পড়লে ক্যারিয়ার খারাপ হবে এমন কিছুও না। সবগুলো বিষয়ই ভালো এবং সব যায়গা থেকেই ভালো করা যায়। এবং সবাই যে মনে করে ব্যবসা শিক্ষা শাখার বিষয় গুলো সহজ, তাও না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো থেকেও কঠিন।তাই কঠিন মনে করে বিজ্ঞান বিভাগ ত্যাগ করে ব্যবসা শিক্ষা কে পছন্দ করলে মনে হয় না ভালো করা যাবে। কারণ যে সহজ কিছু খুঁজতে যাবে, তার কাছে সব কিছুই কঠিন লাগবে। আর কেউ যদি মনে করে না, আমি ব্যবসা শিক্ষা পড়ে ভালো করতে পারব, তাহলে তাই করা উচিত।

কোন বিভাগে পড়বে তুমি, জীবনে তুমি কী হতে চাও, কোনটা তোমার পছন্দ, এ ক্ষেত্রে অন্য কারো মতকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দাও। কারণ জীবনের বাকী সময় নির্ভর করবে এর উপরই।

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker