হাঁটু সমান পানি, সমাধান কোথায়?

এই বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি যেন চট্টগ্রামবাসীর পিছুই ছাড়ছে না। স্বল্প থেকে ভারি বৃষ্টিতে সড়ক-উপসড়কে পানি, বাদ নেই অলিগলিও। টানা বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় দুদিন ধরে পানির নিচে নিমজ্জিত চট্টগ্রাম মহানগরী। সবখানে হাঁটু সমান পানি। প্রায় অর্ধেক গণপরিবহন সড়কে নামতে পারেনি। চট্টগ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। জরুরী প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হলেই দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

ভারি বর্ষণে নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাদুরতলা, জিইসি মোড়সহ নিচু এলাকাগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। নগরীর নিম্নাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানি থইথই অবস্থা। অনেক সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি যত্রতত্র বিকল হয়ে পড়ে থাকে দীর্ঘ সময়। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয়েছে।

একবার নায়ক রিয়াজ বলেছিলেন, “চট্টগ্রামে যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, তা বাংলাদেশের রাস্তা মনে হয়নি। মনে হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার রাস্তা।”

বর্ষা মৌসুম চট্টগ্রামের রাস্তার দুর্দশা দেশের সকলেরই জানা। রিয়াজের ঐ বক্তব্যের পর থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেই ভেসে ওঠে রিয়াজের নাম। স্বভাবতই সেটা প্রশংসায় নয়, বরং ঠাট্টা-মশকরায়।

অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে জলাবদ্ধতা

২০২২ সালের নভেম্বরে, বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে চট্টগ্রামের সাড়ে ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা সরাসরি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে আছে। আর পরোক্ষ ঝুঁকিতে আছে ৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

গবেষকরা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণেই নগররীর এসব এলাকা জলাবদ্ধতার ঝুঁকির মধ্যে আছে। সমীক্ষায় আরও বলা হয়, বিগত ৫৩ বছরে শহরের ৭০ শতাংশ খাল বিলীন হয়ে গেছে।

বর্ষার মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম নগরবাসীকে নাকাল হতে হচ্ছে। বর্ষাকাল চট্টগ্রামের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অল্প থেকে মাঝারি ধরনের বর্ষায়ও হাঁটু সমান পানি থাকে। এতে চট্টগ্রামের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে প্রতি বছর।

নগরীতে ৭০টি খাল ছিল ১৯৬৯ সালের এক জরিপ অনুযায়ী। বেশ কিছু খাল হয়ে গেছে বিলীন বা ভরাট, অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়েছে খাল ড্রেনগুলোর অনেক অংশের উভয় পাড়ে। চট্টগ্রাম ওয়াসা পরিচালিত সমীক্ষা অনুসারে, ৫৩ বছরে খালের সংখ্যা ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ২২টিতে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য মাল্টি হ্যাজার্ড কন্টিনজেন্সি প্ল্যান শীর্ষক সমীক্ষায় আরও জানা গেছে, চসিকের মোট ২২টি ওয়ার্ড সরাসরি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে, এর মধ্যে ৬টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, ৩টি চরম ঝুঁকিতে এবং ১৩ টি ওয়ার্ড মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে।

জলাবদ্ধতার খুব দ্রুত সমাধান করা না হলে ভবিষ্যতে মাত্র ২০০ মিমি বৃষ্টিপাতেও শহরের বেশিরভাগ নিচু এলাকা ১ দশমিক ৩ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে বলে জানান গবেষকেরা।

অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ করতে হবে। সিটি করপোরেশন ও সিডিএ একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাস্তার পাশের ড্রেনগুলোকে সংস্কার করতে হবে, পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ড্রেন পরিষ্কার রাখতে জনগণকে বাধ্য করতে হবে। রাস্তা উঁচু করা সমস্যার সমাধান নয়, রাস্তা উঁচু করার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া বন্ধ করতে হবে। খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। খালের দু’পাশ অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে হবে। একটি শহরের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। হবে। প্রশাসনের সর্বস্তরে জবাবদিহিতা সৃষ্টি করতে হবে এবং জনগণকে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত করতে হবে।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker