সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন গুম : মির্জা ফখরুল

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিরোধী দল ও মতের ব্যক্তিদের গুম করা বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। গতকাল শুক্রবার (২৬ মে) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে এ কথা বলেন তিনি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ উপলক্ষে বিএনপির মহাসচিব এ বাণী দেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেনি। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করে চলেছে আর জোর করে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। ১৪ বছর ধরে তারা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কব্জা করে রাখছে এবং একই সাথে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে তারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে, লুটপাটের রাজনীতি করছে। সরকারি প্রশাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা দলীয়করণ করা হয়েছে। একইভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকারী মানুষ গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছেন, লড়াই করছেন। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে গুম একটি অচেনা বিষয়, কিন্তু বাংলাদেশসহ যেসব দেশে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী সরকার, সেখানে নিজেদের পথের কাঁটা সরানোর জন্য তারা গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।’

গুম হওয়া মানুষদের স্বজনরা এখনও প্রিয়জনদের ফিরে আসার পথ চেয়ে বসে আছে জানিয়ে ফখরুল বলেন, ‘সমাজে মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ সৃষ্টির জন্যই গুমকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে শাসকগোষ্ঠী। মূল লক্ষ্য বিরোধী কণ্ঠকে নির্মূল করা, ফ্যাসিবাদী শাসনকে নিস্কন্টক করা। গুমের অব্যাহত পরিস্থিতিতে দেশে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়ঙ্কর নৈরাজ্য। জনসমর্থনহীন ও ভোটারবিহীন সরকারের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বনই হচ্ছে গুম।’

বিএনপির এই মহাসচিব বলেন, ‘সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিএনপিসহ বিরোধী দলের যেসব নেতাকর্মীদের গুম করেছে, তাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। গুম মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ হলেও বর্তমান আওয়ামী সরকার এসব কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার প্রতি এরা ভ্রুক্ষেপহীন। সবার চোখের সামনে থেকে ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গুম করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরই গুমের বিষয়টি সব আন্তর্জাতিক ফোরামে নির্লজ্জের মতো অস্বীকার করে আসছে। অথচ বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে এর সুষ্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেই সম্ভব সব মানুষের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। কারণ নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারকে আইনি ও নৈতিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি শুনানির আয়োজন করা খুবই প্রয়োজন। প্রতি বছরের মতো এ বছরও মে মাসের শেষ সপ্তাহে পালিত হচ্ছে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ। একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৬৪৭ জন ব্যক্তি গুম হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৪ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে, ৩৯৯ জনকে জীবিত ফেরত পাওয়া গেছে অথবা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, বাকি তিন জনের বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও ১৬১ জনের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। যদিও আমাদের হিসেব মতে এর প্রকৃত সংখ্যা আরও অন্তত তিন থেকে চার গুণ বেশি হবে। সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার এ কৌশল আর কতোদিন চলবে।’

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker