রহস্যে ঘেরা বগা লেক

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” – বহুকাল আগেই লিখেছেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। কবি যেন শুধুই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা করতেই লিখেছেন এই কবিতা। বাংলাদেশের যতদূর যাওয়া যায় ততই বিস্তৃত তার সৌন্দর্য। এই তালিকা থেকে বাদ যায়নি রহস্যে ঘেরা বগা লেক বা বগাকাইন লেক। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে এই লেককে। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নিজেই নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত রহস্য।

ভ্রমণকারীদের কাছে বগা লেক সৌন্দর্যের আধার হলেও স্থানীয়দের কাছে কিন্তু এই লেকের অন্য এক পরিচয় আছে। এই লেক যেন অলৌকিক সৌন্দর্য্যে সাজানো অজস্র রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। এই অজানা পৌরণিক রহস্য বগা লেককে করেছে আরো আকর্ষণীয়।

বগাকাইন হ্রদ বা বগা লেক যে নামেই পরিচিত হোক না কেন এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির হ্রদ। বান্দরবন শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগাকাইন হ্রদের অবস্থান কেওক্রাডং পর্বতের গা ঘেষে, রুমা উপজেলায়। রুমা উপজেলার পূর্ব দিকে শঙ্খ নদীর তীর থেকে ২৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি মৌজার নাম ‘নাইতং মৌজা’। এই মৌজার পলিতাই পর্বতশ্রেণীর অন্তর্গত ফানেল আকৃতির ছোট পাহাড়ের চূড়ায় বগা হ্রদ অবস্থিত যার অদ্ভুত গঠন অনেকটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতো।

এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২৪৬ ফুটউচ্চতার মধ্যবর্তী অবস্থানের একটি মালভূমিতে অবস্থিত। এটি প্রায় ৩৮ মিটার গভীর। বগা লেক সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ আর আশেপাশে পানির কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। তাহলে হ্রদে পানি আসলো কই থেকে? পানি আসার জায়গা নেই আবার পানি শূন্যতা ও দেখা যায়না! তাহলে কি রহস্য এই লেক সৃষ্টির?

রহস্যে ঘেরা বগা লেক এর উৎপত্তি

বগাকাইন হ্রদ ঘিরে রয়েছে বম, মারমা, ম্রো, খুমি ও ত্রিপুরাদের বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনি । এমন একটি পৌরাণিক কাহিনি হল ড্রাগন রহস্য। কথিত আছে বগাহ্রদের পাশে একটি বম পাড়া এবং একটি মুরং পাড়া আছে। যেখানে আবাস ছিল বম, মুরং, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরাসহ অন্যান্য আদিবাসীদের। স্থানীয় আদিবাসীদের উপকথা অনুযায়ী, অনেক কাল আগে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো। বম ভাষায় ড্রাগনকে ‘বগা’ বলা হয়। ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু একবার কয়েকজন মিলে এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূঁড়াটি জলমগ্ন হ্রদে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। যদিও এই উপকথার কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই, তবুও উপকথার আগুন উদগীরণকারী ড্রাগন এবং হ্রদের জ্বালামুখের মতো গঠন মৃত আগ্নেয়গিরির ধারণাটির সাথে মিলে যায়।

অপর এক পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে বগা লেক ছিল একটি সমৃদ্ধ ম্রো গ্রাম। গ্রামের পাশে একটি সুড়ঙ্গে বড় আকারের সাপ থাকত। এক দিন ওই সাপ গ্রামবাসী ধরে খেয়ে ফেলে। ওই সাপ খাওয়ায় নাগরাজার অভিশাপের কারণে গ্রামবাসীসহ গ্রামটি দেবে গিয়ে বগা লেকের সৃষ্টি হয়। এখনো অনেক আদিবাসী বিশ্বাস করে হ্রদের গভীরে থাকা নাগরাজ লেজ নাড়ালে হ্রদের পানি ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

বগা লেক নিয়ে প্রচলিত এই পৌরাণিক কাহিনীর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিকগণের মতে বগাকাইন হ্রদ কোনো মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার ভূমিধ্বসের কারণেও এটি সৃষ্টি হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন। এটি ভুবন স্তরসমষ্টির নরম শিলা দ্বারা গঠিত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর পানি বেশ অম্লধর্মী যার কারণে এতে কোনো শ্যাওলা বা অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ নেই, এবং কোনো জলজ প্রাণীও এখানে বাঁচতে পারেনা বলা হয়েছে। তবে ২০০৯-এর তথ্যসূত্রে জানা যায় বগা হ্রদের পানি অত্যন্ত সুপেয়, এবং হ্রদের জলে প্রচুর শ্যাওলা, শালুক, শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ এবং প্রচুর মাছ রয়েছে।

বগা লেকের পানি ঘোলা হাওয়ার সাথে নাগরাজের লোক লোক কাহিনী প্রচলিত থাকলেও এর একটা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আছে। হ্রদের পানি কখনও পরিষ্কার আবার কখনওবা ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়। এতেই হ্রদের পানি কিছুটা ঘোলাটে হয়ে পড়ে।

এছাড়াও স্থানীয় অধিবাসীদের ধারণা এই হ্রদের আশেপাশে দেবতারা বাস করে। এজন্য তারা এখানে পূজা দেন। তবে রহস্যময় উপকথা এবং অকল্পনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বগাকাইন হ্রদকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেকিং এবং ক্যাম্পিং এলাকায় পরিণত করেছে।

রহস্যে ঘেরা বগা লেক ঘিরে অবাস্তব গল্প থাকলেও এই লেক নিয়ে একটি কথা খুব সহজে বলা যায় – কিছু রহস্য রহস্যই থাকতে হয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য্য তার অভেদ্য রহস্যে রয়।

ভ্রমণ থেকে আরো পড়ুন

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker